হাঁটুর ব্যথা কমাতে ঘরোয়া পদ্ধতি
প্রতিদিনের স্বাভাবিক চলাফেরা, সিঁড়ি ভাঙা, বসা বা ওঠার মতো কাজ হঠাৎ করেই কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে যদি হাঁটুর ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা শুধু বয়সজনিত নয়; অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, ব্যায়ামের অভাব কিংবা পুরনো আঘাতও এর কারণ হতে পারে। ওষুধের ওপর নির্ভর না করে অনেকেই খুঁজে নেন ঘরোয়া সহজ সমাধান, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় ছাড়াই হাঁটুর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। প্রাকৃতিক এই উপায়গুলো শুধু ব্যথা উপশমই নয়, হাঁটুর হাড় ও জোড়াকেও শক্ত রাখতে ভূমিকা রাখে। এমন কিছু ঘরোয়া উপায় নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা । তো চলুন শুরু করা যাক ।
হাঁটুর ব্যথার সাধারণ কারণঃ
প্রথমেই জেনে নিই হাঁটুর ব্যথা হওয়ার সাধারণ কিছু কারণ।
১ । অস্টিওআর্থ্রাইটিস এর কারণে : বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড়ের জয়েন্টের কার্টিলেজ ক্ষয়ে যেতে থাকে ফলে আমাদের হাঁটুতে ব্যথার মতো সমস্যা সৃষ্টি হয়।
২ । গাউট বা ইউরিক এসিড বৃদ্ধির কারণে: আমাদের শরীরে যখন ইউরিক এসিড বেড়ে যায়, তখন আমাদের হাঁটুর জয়েন্ট ফুলে যায় ও ব্যথার সূচনা হয়।
৩ । চোট বা আঘাতের কারণে: খেলাধুলা করতে গিয়ে বা কোন কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে তখন আমাদের হাটুতে ব্যথার উৎপাত হতে পারে ।
৪ । স্থূলতা বা মুটিয়ে যাওয়ার কারণে: আমরা যখন অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাই বা অতিরিক্ত মুটিয়ে যাই তখন আমাদের হাঁটুর উপর অতিরিক্ত ওজনের কারণে প্রচন্ড চাপ পড়ে । এর ফলে অতিরিক্ত ওজন হাঁটুর উপর পড়ার কারণে আমাদের হাঁটুতে ব্যথার সূত্রপাত হয় ।
৫ । ব্যায়ামের না করার কারণে: আমরা যদি ব্যায়াম না করি, তাহলে আমাদের মাংশপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে । এর ফলে আমাদের হাঁটুর উপর সাপোর্ট কমে যায়। শুরু হয় হাঁটুতে ব্যথার মতো সমস্যা ।
এই কারণগুলো জানা আমাদের জন্য খুবই জরুরি, কারণ মূল সমস্যাটা আডেন্টিফাই না করলে বা না বুঝলে আমাদের চিকিৎসাও কাজে আসবেনা বা ঘরোয়া পদ্ধতিগুলোও সঠিকভাবে কাজ করবে না।
হাঁটুর ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
১️ । গরম ও ঠান্ডা সেঁক
যখন গরম পানির ব্যাগ দিয়ে হাঁটুতে সেঁক দিবেন তখন রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যাবে এবং ব্যথা কমে যাবে । আবার অন্যদিকে, যখন ঠান্ডা বরফের প্যাক দিয়ে সেঁক দিবেন তখন ফুলে যাওয়া কমে যায় ।
প্রশ্ন জাগতে পারে কিভাবে দিবেন এই সেক ? আপনি দিনে ২-৩ বার ১০-১৫ মিনিট সেঁক দিতে পারেন। একটা কথা মাথায় রাখবেন সরাসরি ত্বকে বরফ দেবেন না, কাপড় মুড়ে তারপর সেঁক দিয়ে নিবেন।
২️ । হলুদের দুধ
হলুদের মধ্যে আছে কারকিউমিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণেভরপুর । এই ব্যথা কমাতে আপনি প্রতিদিন ১ গ্লাস গরম দুধে আধা চা-চামচ হলুদ মিশিয়ে তারপর রাতে পান করুন। এই প্রক্রিয়া আপনার জয়েন্টের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করবে ।
৩️ । আদা ও লেবুর চা
আদা ও লেবুর চা আমাদের আরোও অনেক উপকারের সাথে সাথে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় ও ব্যথাও কমায়। এজন্য আপনি ১ কাপ গরম পানিতে ১ চা-চামচ আদা কুঁচি ও কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে নিন । এভাবে মিশ্রিত করে আপনি দিনে ২ বার পান করতে পারেন। এতে আপনার হাটুর ব্যথা উপশম হতে পারে ।
৪️ । সরিষার তেলের ম্যাসাজ
সরিষার তেলেরও আছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণাগুণ । সরিষার তেল আপনি কিভাবে লাগাবেন । এই সরিষার তেল আপনি হালকা গরম করে নিন । গরম করে নিয়ে আপনার হাঁটুর চারপাশে ম্যাসাজ করে নিন । দেখবেন আপনার হাটুর পেশি শিথিল হয়ে আসবে এবং ব্যথাও কমে যাবে । ফল আরোও ভালো পেতে আপনি ম্যাসাজের পর ৩০ মিনিটের জন্য গরম কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখতে পারেন । এতে আপনি আরো বেশি আরাম পাবেন ।
৫️ । লবণ পানির গরম সেঁক
লবণেও আছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণাবলী । এক কাপ লবণ গরম পানিতে মিশিয়ে নিন । এরপর আপনি এই পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে আপনার আক্রান্ত হাটুতে সেঁক দিন। দেখবেন লবণের মিনারেল ব্যথা ও ফোলাভাব দুটোই কমাবে ।
৬️ । মেথি দানা
মেথির মধ্যেও প্রদাহনাশক উপাদান বিদ্যমান । যেটা আপনার জয়েন্টের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এ জন্য আপনাকে যা করতে হবে । আপনাকে রাতে্র বেলা ১ চা-চামচ মেথি ভিজিয়ে রাখতে হবে । এরপর সকালে এই ভেজানো মেথি আপনাকে খালি পেটে খেতে হবে ।
৭️ । আপেল সিডার ভিনেগার
আপেল সিডার ভিনেগার আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন ? এক গ্লাস গরম পানিতে ১ চা-চামচ আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে নিন । এরপর এই আপেল সিডার ভিনেগার মিশ্রিত পানি দিনে ১ বার পান করুন । দেখবেন এটি আপনার শরীরের থেকে টক্সিন দূর করবে এবং ব্যথাও কমাতে সাহায্য করবে ।
হাঁটুর ব্যথা কমাতে আপনাকে এতক্ষণ আলোচিত এই ৭টি ঘরোয়া উপায় এপ্লাই ছাড়াও খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে যেমনঃ
১ । আপনাকে বেশি করে সবুজ শাকসবজি, দুধ, দই, বাদাম, মাছ এগুলো খেতে হবে । এই সমস্ত খাবার ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডিতে সমৃদ্ধ থাকে ।
২ । আপনাকে লবণ ও চিনি খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে ।
৩ । যদি আপনার ইউরিক এসিড বেড়ে যায়, তাহলে লাল মাংস, ডাল, মটরশুঁটি এই জাতীয় খাবার কম খেতে হবে ।
৪ । যে সমস্ত খাবার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডে পরিপূর্ণ । সেই জাতীয় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার বেশি বেশি খেতে হবে । যেমনঃ এর মধ্যে আছে স্যামন মাছ, আখরোট, চিয়া সিড, ফ্লাক্স সিড, বাদাম ইত্যাদি ।
ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায় এবং খাদ্যাভ্যাস ছাড়াও আপনাকে ব্যায়াম ও ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি চালাতে হবে । এজন্য আপনি যা করতে পারেনঃ
১ । হাঁটার অভ্যাস করতে পারেন ।
প্রতিদিন অন্তত.২০-৩০ মিনিট হাঁটুন । এই অভ্যাস আপনার হাঁটুর জয়েন্টকে সচল রাখতে সাহায্য করবে ।
২ । আপনি স্ট্রেচিং করতে পারেন ।
হালকা স্ট্রেচিং এবং ব্যায়াম আপনার মাংসপেশিকে শক্তিশালী করে।
এজন্য আপনি কোয়াড্রিসেপ স্ট্রেচিং, হ্যামস্ট্রিং স্ট্রেচিং করতে পারেন ।
৩ । লেগ লিফট করতে পারেন ।
এ জন্য আপনি চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে পা উঠিয়ে কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন। এটা আপনি দিনে ১০-১৫ বার এপ্লাই করতে পারেন ।
৪ । আপনি সাঁতার কাটতে পারেন ।
সাঁতার হচ্ছে চমৎকার একটি ব্যায়াম । যে ব্যায়ামে শরীরের প্রায় প্রত্যেকটি অঙ্গই ব্যবহৃত হয় । যারা হাঁটুর ব্যথায় ভুগছেন তাদের জন্য সাঁতার একটি চমৎকার ফলদায়ক ব্যায়াম। তাই আপনি নিয়মিত সাঁতার কাটতে পারেন । এটা শুধু আপনার হাঁটুকেই ভালো রাখবেনা, আপনার পুরো শরীরকেই ফিট রাখবে ।
এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম এর বাইরেও আপনাকে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।
অতিরিক্ত ওজন হাঁটুর ব্যথার অন্যতম বড় কারণ।
অতিরিক্ত ওজন আপনার হাঁটুর জয়েন্টে চারগুণ চাপ সৃষ্টি করে।
তাই আপনাকে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ।
কিছু বাড়তি কাজ আপনাকে করতে হবে । যেমনঃ
১ । হঠাৎ করে ভারী জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এড়িয়ে চলতে হবে।
২ । ব্যথা বেড়ে গেলে বিশ্রাম নিতে হবে ।
৩ । যদি হাঁটুর ব্যথা ৭ দিনের বেশি থাকে বা ফুলে যায়, তখন অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে।
বন্ধুরা মানসিক চাপ শরীরের প্রদাহ বাড়াতে পারে। তাই আপনাকে
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘু্মাতে হবে । আপনি মেডিটেশন করতে পারেন । মেডিটেশন ও রিল্যাক্সেশন হাঁটুর ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
সম্মানিত সুধি, হাঁটুর ব্যথা কমানোর জন্য এই ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো নিয়মিতভাবে মেনে চললে ধীরে ধীরে আপনি উপকার পাবেন। তবে মনে রাখবেন, ঘরোয়া উপায় কখনোই ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়। প্রয়োজনে অবশ্যই আপনি একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
Post a Comment