ভিটামিন আবিষ্কারের কাহিনী

আমাদের দেহ নামের এই জটিল যন্ত্রটির জ্বালানি কী? একটা সময় আমরা ভাবতাম প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, মিনারেল—এগুলোই সব। কিন্তু না আমাদের এই দেহ নামের জটিল যন্ত্রটির জন্য শুধু এই চারটে উপাদান যথেষ্ট ছিল না। প্রাচীন যুগে, অজানা এক অভিশাপের মতো রোগ এসে কেড়ে নিত আমাদের প্রাণ— যেমন স্কার্ভি, বেরিবেরি, রিকেটস ইত্যাদি । এই রোগগুলো ছিল রহস্যময়; বিজ্ঞানীরা ভাবতেন এগুলি হয়তো কোনো সংক্রমণ বা বিষক্রিয়ার ফল।

সেই অন্ধকার যুগে, আমরা আদৌও বুঝতে পারিনি যে জীবনের জন্য অপরিহার্য কিছু ক্ষুদ্র অনু আমাদের খাদ্যে অনুপস্থিত। এগুলি এতই ক্ষুদ্র যে এদের গুরুত্ব বুঝতে আমাদের শত শত বছর লেগে গিয়েছিলো । কিন্তু এই ছোট ছোট ক্ষুদ্র অনুই ছিলো ভিটামিন । আর এই ভিটামিনের আবিষ্কার কেবল বিজ্ঞানের জয় ছিল না; এটি ছিল মানবজাতির সহানুভূতি, অধ্যবসায় এবং বেঁচে থাকার এক গভীর আকাঙ্ক্ষার গল্প।

তো আজকের আলোচনায় আমরা আপনাদের জানানোর চেষ্টা করবো সেই অতি ক্ষুদ্র অনু, মানে ভিটামিন আবিষ্কারের গল্প । তাহলে চলুন শুরু করা যাক । যারা এই জাতীয় স্টোরী শুনতে মজা পেয়ে থাকেন, আশা করছি নিরাশ হবেন না । আজকের এই আবিষ্কারে আমরা বুঝেছিলাম, বেঁচে থাকার জন্য শুধু বড় বড় খাবার নয়, ছোট ছোট উপাদানেরও প্রয়োজন হয়। এই আবিষ্কারটি ছিল আমাদের স্বাস্থ্য ও রোগ বালাই বোঝার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক অর্জন।

মানুষ ভিটামিনের ধারণা পাবার বহু আগেই কিছু খাবারের স্বাস্থ্য রক্ষার অবদান সম্পর্কে অবগত ছিল। যেমন, প্রাচীন মিশরের কথাই ধরা যাক । তারা জানত যে কেউ যদি রাতে দেখতে না পায়, অর্থাৎ রাতকানা হলে তাকে যকৃৎ বা কলিজা খাওয়ালে সে উপকার পেতে পারে। কিন্তু আজ আমরা জানি, এটি হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবজনিত সমস্যা ।

কিন্তু সেই ট্র্যাজেডির শুরু হয় যখন মানুষ সমুদ্র জয় করতে বের হলো—‘In the Age of Discovery’ বা আবিষ্কারের যুগে। মাসের পর মাস যখন কেটে যেত জাহাজেই, সেখানে যোগান থাকতোনা কোনো টাটকা ফল ও সবজির । আর এই অবস্থার প্রেক্ষিতে নাবিকদের মধ্যে ভিটামিনের অভাবে সৃষ্ট রোগ, বিশেষত স্কার্ভি দেখা দিতো এবং এটি হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ ব্যাপার ।

স্কার্ভি—এই নামটি শুনলেই যেন যন্ত্রণা অনুভব করা যায়। শরীরের কোলাজেন সঠিকভাবে তৈরি হতে পারত না, যার ফলে ক্ষত ঠিক মতো শুকাত না, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ত, অসহ্য ব্যথা হতো, এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ মৃত্যুতে ঢলে পড়তো। ১৭৪৭ সালে স্কটিশ সার্জন জেমস লিন্ড আবিষ্কার করেন যে, টক জাতীয় ফল খেলে স্কার্ভি প্রতিরোধ করা সম্ভব। ১৭৫৩ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Treatise on the Scurvy" প্রকাশ করেন, যেখানে লেবু এবং লেবু জাতীয় ফলের ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি এটি গ্রহণও করে। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! উনিশ শতকে যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজে ফলানো লাইমকে লেবুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হলো, দেখা গেল তাতে ভিটামিন সি তুলনামুলক কম। ফলে আর্কটিক অভিযানকারীরা তখনও স্কার্ভির শিকার হতে থাকলেন। ২০ শতকের গোড়ার দিকে রবার্ট ফ্যালকন স্কটের অ্যান্টার্কটিক অভিযানেও একই সমস্যা হয়েছিল, কারণ তখনকার প্রভাবশালী চিকিৎসা তত্ত্ব মনে করত স্কার্ভি হয় 'দূষিত' টিনের খাবারের কারণে।

একইভাবে, পূর্ব এশিয়ায়—যেখানে মধ্যবিত্তদের প্রধান খাবার ছিল পালিশ করা সাদা চাল এবং সেই সাথে বেরিবেরি ছিল মহামারী। ব্রিটিশ-প্রশিক্ষিত জাপানি নৌবাহিনীর ডাক্তার তাকাকি কানেহিরো ১৮৮৪ সালে লক্ষ্য করেন, যারা শুধু ভাত খেত, তাদের মধ্যেই বেরিবেরি বেশি। তিনি পরীক্ষা করে দেখেন, শুধু সাদা চালের পরিবর্তে মাংস, মাছ, বার্লি এবং বিন্সযুক্ত খাবার খেলে এই রোগ কমে যায়। যদিও তিনি ভুল করে ভেবেছিলেন প্রোটিনের অভাব এর কারণ, তবুও খাদ্যের ভূমিকা যে এখানে প্রধান, সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।

বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করলেন, পরিচিত প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা এবং মিনারেলস ছাড়াও খাদ্যের মধ্যে এমন কিছু 'অজানা পদার্থ' আছে যা জীবনের জন্য অপরিহার্য। ১৮৮১ সালে রাশিয়ার চিকিৎসক নিকোলাই লুনিন ইউনিভার্সিটি অফ টারটুতে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান। তিনি ইঁদুরগুলোকে কেবল দুধে থাকা উপাদানগুলো  দিয়ে তৈরি কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়ান। এর ফলে, সেই ইঁদুরগুলি সব মারা যায়। অথচ যেসব ইদুর সাধারণ দুধ খেয়েছিল, তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। লুনিন এই পরীক্ষা নিরিক্ষার পর এই সিদ্ধান্ত টানলেন যে, "দুধের মতো প্রাকৃতিক খাবারে এই পরিচিত প্রধান উপাদানগুলি ছাড়াও জীবনের জন্য অপরিহার্য কিছু অজানা পদার্থ অবশ্যই রয়েছে"। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তাঁর এডভাইজার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলেন না ।

তবে আশার আলো দেখান ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান (Christiaan Eijkman)। ১৮৯৭ সালে তিনি আবিষ্কার করেন যে, মুরগিদের পালিশ করা সাদা চালের পরিবর্তে খোসাযুক্ত বাদামি চাল খাওয়ালে বেরিবেরি-সদৃশ পলি নিউরাইটিস রোগ প্রতিরোধ করা যায়। তিনি এর নাম দেন "অ্যান্টি-বেরিবেরি ফ্যাক্টর"। এর পরের বছর, ফ্রেডেরিক হপকিন্স অনুমান করে বলেন যে কিছু খাদ্যে "অ্যাকসেসরি ফ্যাক্টর" বা আনুষঙ্গিক উপাদান থাকে, যা শরীরের কাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

পরবর্তিতে বিজ্ঞানী আইকম্যান এবং হপকিন্স দু'জনেই তাদের মহৎ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান । এইভাবেই ধাপে ধাপে, এক নীরব সংগ্রামের মাধ্যমে, বিজ্ঞানীরা রোগের কারণকে সংক্রমণ বা বিষক্রিয়া থেকে সরিয়ে এনে পুষ্টির অভাবের দিকে মনোনিবেশ করলেন। ১৯১০ সালে জাপানি বিজ্ঞানী উমেতারো সুজুকি প্রথম একটি জল-দ্রবণীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট কমপ্লেক্স চালের তুষ থেকে আলাদা করতে সফল হন এবং এর নাম দেন অ্যাবেরিক অ্যাসিড  পরে এটিকে অরিজানিন  বলা হয়। যদিও তাঁর আবিষ্কার জাপানি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়, কিন্তু জার্মান অনুবাদে এটিকে নতুন আবিষ্কৃত পুষ্টি উপাদান হিসেবে উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয় । এর ফলে তিনি বৈশ্বিক পরিচিতি পাননি।

কিন্তু এর ঠিক দু'বছর পর, ১৯১২ সালে, পোলিশ বংশোদ্ভূত বায়োকেমিস্ট ক্যাসিমির ফাঙ্ক (Casimir Funk) যিনি লন্ডনের বিখ্যাত লিস্টার ইনস্টিটিউটে কাজ করতেন—একই ধরনের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট কমপ্লেক্স আলাদা করেন। ক্যাসিমির ফাঙ্কের এই গবেষণা একটি নতুন যুগের সূচনা করে। তিনিই প্রথম এই জটিল উপাদানগুলির একটি নাম প্রস্তাব করেন: "ভিটামিন" (Vitamine)। এটি ছিল একটি সংযুক্ত শব্দ, যার পূর্ণরূপ হলো Vital Amine। Vita হচ্ছে ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ Life মানে জীবন ।  ফাঙ্কের ধারণা ছিল যে এই অপরিহার্য খাদ্য উপাদানগুলি জীবন ধারণের জন্য 'ভাইটাল' বা গুরুত্বপূর্ণ এবং এদের রাসায়নিক গঠনে 'অ্যামিন' গ্রুপ বা নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের বন্ধনে তৈরি রাসায়নিক উপাদান বিদ্যমান।

এই শব্দটি এতটাই দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে এটি হপকিন্সের 'একসেসরি ফ্যাক্টর’-এর সমার্থক হয়ে ওঠে। ফাঙ্ক তখন ধারণা করেছিলেন যে বেরিবেরি ছাড়াও রিকেটস, পেলেগ্রা, সিলিয়াক রোগ এবং স্কার্ভির মতো অন্যান্য রোগও ভিটামিন দিয়ে নিরাময় করা যেতে পারে।

কিন্তু বিজ্ঞানের পথ তো আর মসৃণ হয় না। কিছুদিনের মধ্যেই গবেষকরা সন্দেহ করতে শুরু করলেন যে সব 'ভিটামিন'-এর মধ্যে অ্যামিন (Amine) উপাদান নেই। বিশেষ করে ভিটামিন A-তে অ্যামিন গ্রুপ ছিল না। ফলে ১৯২০ সালে জ্যাক সেসিল ড্রামন্ড প্রস্তাব করেন যে নামের শেষ থেকে অতিরিক্ত ‘e’ অক্ষরটি বাদ দেওয়া হোক। এইভাবেই 'Vitamine' পরিবর্তিত হয়ে আজকের পরিচিত শব্দ 'Vitamin' এ রূপ নেয়।

ভিটামিন আবিষ্কারের বাস্তবতা কোনো পৌরাণিক বৈজ্ঞানিক সাফল্যের গল্প ছিল না। বরং এটি ছিল ধীর, ধাপে ধাপে অগ্রগতি বা ব্যর্থতা, বৈপরীত্য, খণ্ডন এবং সামগ্রীক শ্রমের ফসল ।

No comments

Powered by Blogger.