আমড়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা
বন্ধুরা, সবাইকে স্বাগতম। আজ আমরা কথা বলবো আমাদের দেশের এক অতি পরিচিত, কিন্তু অনেকটা অবহেলিত একটি ফল নিয়ে। সেটা হলো— আমড়া। গ্রামবাংলার আঙিনা থেকে শুরু করে শহরের বাজার—সব জায়গায় এই ফলটি পাওয়া যায়। কাঁচা অবস্থায় টক, পাকা অবস্থায় মিষ্টি—আমড়া খেতে যেমন মজাদার, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অসাধারণ স্বাস্থ্য উপকারিতা।
কিন্তু আমরা কি জানি, এই ছোট্ট ফলটিই আমাদের শরীরকে কত বড় বড় রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে? আজকের আলোচনাতে আমরা জানবো—আমড়ার পুষ্টিগুণ, ভিটামিন ও মিনারেলের ভাণ্ডার, দেহের কোন কোন সমস্যায় এটি কার্যকরী, আর নিয়মিত আমড়া খাওয়ার মাধ্যমে কীভাবে আমরা সুস্থ থাকতে পারি।
তাহলে চলুন, শুরু করা যাক ।
আমড়ার পরিচয় ও ইতিহাস
আমড়া বা Hog Plum দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মতো দেশে ব্যাপকভাবে জন্মায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Spondias pinnata। এটি অ্যানাকার্ডিয়াসি (Anacardiaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশে প্রধানত দুটি ধরণের আমড়া দেখা যায়—
১ । দেশি আমড়া
২ । বড় বা বিলাতি আমড়া
দেশি আমড়া ছোট, টক এবং আঁশযুক্ত হয়। আর বিলাতি আমড়া তুলনামূলক বড়, আঁশ কম এবং স্বাদে মিষ্টি।
আমড়া শুধু খাওয়ার ফল নয়, আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যেরও অংশ। ছোটবেলায় আমরা অনেকে কাঁচা আমড়া লবণ-মরিচ দিয়ে খেয়েছি, কেউ আবার আমড়ার আচার বানিয়েছে, আবার কেউ জুস বা চাটনি করেছে।
কিন্তু শুধু স্বাদের জন্য নয়, আমাদের পূর্বপুরুষরা আমড়াকে ওষুধি ফল হিসেবেও ব্যবহার করতেন। বিশেষত, গ্রীষ্মকালে শরীর ঠান্ডা রাখতে, হজম শক্তি বাড়াতে এবং পেটের অসুখ দূর করতে আমড়ার ব্যবহার বহু পুরনো।
আমড়ার পুষ্টিগুণ
আমড়া হলো একেবারেই কম ক্যালোরিযুক্ত, অথচ ভিটামিন ও মিনারেলে সমৃদ্ধ একটি ফল। প্রতি ১০০ গ্রাম আমড়ায় পাওয়া যায়—
ক্যালোরি: প্রায় ৬৬ কিলোক্যালরি
কার্বোহাইড্রেট: ১৪-১৫ গ্রাম
প্রোটিন: ১ গ্রাম
ফাইবার: ৩-৪ গ্রাম
ভিটামিন সি: ৩০-৪০ মিলিগ্রাম
ভিটামিন এ: সামান্য পরিমাণ
ক্যালসিয়াম: ৪০-৫০ মিলিগ্রাম
আয়রন: ১-২ মিলিগ্রাম
এ ছাড়াও পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাসও পাওয়া যায় এই আমড়াতে ।
বিশেষ করে ভিটামিন সি-এর জন্য আমড়া বিখ্যাত। একটি মাঝারি সাইজের আমড়ায় লেবুর চেয়েও বেশি ভিটামিন সি থাকতে পারে। আর এই ভিটামিন সি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বক সুন্দর করে, আর দেহকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেজ থেকে সুরক্ষা দেয়।
ফাইবারও আমড়ার একটি বড় সম্পদ। যারা হজমের সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য আমড়া কার্যকর। কারণ এতে থাকা ফাইবার পেট ভরে রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং অন্ত্র পরিষ্কার রাখে। এছাড়া ক্যালসিয়াম ও আয়রন আমাদের হাড়কে শক্তিশালী করে এবং রক্তাল্পতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
চলুন এবার আমড়ার ১০টি প্রধান স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলোকি সেটা জানা যাক ঃ
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
আমড়ার ভিটামিন সি শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত আমড়া খেলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ কম হয়। সর্দি-কাশি, ফ্লু কিংবা মৌসুমি জ্বরের মতো রোগ সহজে দেহে বাসা বাঁধতে পারে না।
২. হজমশক্তি উন্নত করে
আমড়ায় প্রচুর ফাইবার থাকায় এটি হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখে। যারা অ্যাসিডিটি, অম্বল বা পেট ফাঁপার সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য কাঁচা আমড়া খাওয়া উপকারী। এছাড়া আমড়ার অম্লীয় স্বাদ হজম এনজাইম সক্রিয় করে, ফলে খাবার দ্রুত ভাঙতে সাহায্য করে।
৩. ওজন কমাতে সহায়ক
আমড়া হলো লো-ক্যালোরি ও হাই-ফাইবার ফল। যারা ডায়েট করছেন, তারা যদি নাস্তার তালিকায় আমড়া রাখেন, তাহলে দ্রুত পেট ভরে যাবে এবং অযথা খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। ফলে ওজন কমাতে সহায়ক হবে।
৪. রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে
আমড়ায় আছে আয়রন, যা রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য এটি খুব উপকারী। যারা অ্যানিমিয়ার সমস্যায় ভুগছেন, তারা নিয়মিত আমড়া খেলে রক্তস্বল্পতা অনেকটা কমে যাবে।
৫. দাঁত ও মাড়ি শক্ত করে
আমড়ার ভিটামিন সি দাঁত ও মাড়ির জন্য অসাধারণ উপকারী। এটি মাড়ির রক্তক্ষরণ বন্ধ করে, দাঁতের শিকড় মজবুত করে এবং মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। অনেকে আবার আমড়া পাতার রস দিয়ে গার্গল করেন যাতে মাড়ি সুস্থ থাকে।
৬. হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা
আমড়ায় থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান হার্টকে ফ্রি র্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। ফলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়।
৭. ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি
আমড়ায় থাকা ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে। ফলে ত্বক টানটান থাকে, বলিরেখা কম হয় এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। অনেকেই আমড়ার পেস্ট মুখে লাগিয়ে ফেসপ্যাক হিসেবেও ব্যবহার করেন।
৮. লিভারের জন্য ভালো
আমড়া লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে লিভার ক্লান্ত হয়ে যায়। আমড়া খেলে লিভারের টক্সিন বের হয়ে যায় এবং লিভার সতেজ থাকে।
৯. চোখের দৃষ্টি রক্ষা করে
যদিও আমড়ায় ভিটামিন এ খুব বেশি নেই, তবে যে সামান্য আছে তা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নিয়মিত আমড়া খেলে দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে এবং রাত কানা হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
১০. শরীর ঠান্ডা রাখে
গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত গরমে শরীরের ভেতরে হিট বাড়ে। আমড়ার রস শরীর ঠান্ডা রাখতে দারুণ কাজ করে। এজন্য অনেকেই আমড়ার শরবত বানিয়ে পান করেন।
আসেন এখন আমড়ার ব্যবহার ও খাওয়ার উপায় নিয়ে একটু আলাপ করা যাক
আমড়া খাওয়ার অনেকগুলো উপায় আছে—
১ । কাঁচা অবস্থায়: লবণ-মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া যায়।
২ । পাকা অবস্থায়: সরাসরি ফলের মতো খাওয়া যায়।
৩ । আচার: বাংলাদেশে আমড়ার আচার খুব জনপ্রিয়।
৪ । চাটনি: মশলা দিয়ে আমড়ার টক-মিষ্টি চাটনি বানানো হয়।
৫ । শরবত/জুস: গরমকালে শরীর ঠান্ডা রাখতে আমড়ার শরবত অসাধারণ।
৬ । রান্নায় ব্যবহার: ডাল বা মাছের ঝোলে আমড়া দিলে খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ হয়ে যায়।
আমড়া যদিও উপকারী, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে ।
অতিরিক্ত আমড়া খেলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে।
যাদের আলসার বা তীব্র অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে, তারা কাঁচা আমড়া এড়িয়ে চলুন।
খুব বেশি খেলে পেট ব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে।
ডায়াবেটিক রোগীরা মিষ্টি আচার বা জুস খাওয়ার সময় সচেতন থাকবেন।
বন্ধুরা, আমরা প্রতিদিন অনেক দামি ফল খুঁজি—আম, কমলা, আপেল, আঙুর। অথচ আমাদের আশেপাশের সহজলভ্য ফলগুলোকে আমরা প্রায়ই অবহেলা করি। আমড়া ফল তার অন্যতম উদাহরণ। এই ছোট্ট ফলটির ভেতরে লুকিয়ে আছে ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা আমাদের শরীরের জন্য দারুণ উপকারী।
আমড়া যেমন হজম শক্তি বাড়ায়, তেমনি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ওজন কমাতে সাহায্য করে, আবার ত্বক ও হৃদযন্ত্রকেও সুরক্ষা দেয় ।
তাই আজ থেকে আমড়াকে কেবল টক-মিষ্টি মজার ফল হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতির এক অসাধারণ ওষুধি উপহার হিসেবে দেখুন।
আজ এ পর্যন্তই । কথা হবে পরের কোন এপিসোডে নতুন কোন বিষয় । আশা করছি সেদিনও আপনাদের সঙ্গ পাবো । নিয়মিত হাটুন সুস্থ থাকুন । আল্লাহ হাফেজ ।
Post a Comment