কোলেস্টেরল কমাতে কি খাবেন?

আমাদের দেশে দিন দিন হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের মতো রোগ বাড়ছে, আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল জমে যাওয়া। অনেকে মনে করেন কোলেস্টেরল মানেই খারাপ কিছু, কিন্তু আসলে তা নয়। শরীরের জন্য কিছু কোলেস্টেরল দরকার হয়—কিন্তু সমস্যা হয় যখন "খারাপ কোলেস্টেরল" বা LDL বেড়ে যায়, আর "ভালো কোলেস্টেরল" বা HDL কমে যায়।

তাহলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় কোলেস্টেরল? ওষুধ খাওয়ার আগেই কি আমরা খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল কমাতে পারি? উত্তর হলো—হ্যাঁ! আজকের আলোচনাতে ধাপে ধাপে জানাবো কোন কোন খাবার খেলে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকবে, হার্ট সুস্থ থাকবে, আর দীর্ঘ জীবন উপভোগ করতে পারবেন। তাহলে চলুন শুরু করা যাক .

প্রথমেই জেনে নেইয়া যাক কোলেস্টেরল আসলে কী?
কোলেস্টেরল হলো এক ধরনের ফ্যাটি সাবস্ট্যান্স বা চর্বি, যা আমাদের লিভার তৈরি করে এবং কিছু খাবার থেকেও আমরা পাই। এটি আমাদের শরীরের হরমোন, ভিটামিন ডি এবং কোষের দেয়াল তৈরি করতে সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল জমে রক্তনালীতে প্লাক তৈরি করে। এতে রক্তপ্রবাহ কমে যায়, ব্লকেজ হয়, এবং শেষ পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কোলেস্টেরলের ধরন:

১ । LDL (Low Density Lipoprotein): এটিকে বলা হয় খারাপ কোলেস্টেরল। বেশি হলে রক্তনালী ব্লক করে।

২ । HDL (High Density Lipoprotein): এটি ভালো কোলেস্টেরল। এটি খারাপ কোলেস্টেরলকে লিভারে নিয়ে যায় এবং শরীর থেকে বের করে দেয়।

৩ । Triglycerides: রক্তে এক ধরনের ফ্যাট, যা বেড়ে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

তাহলে বুঝতেই পারছেন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে আমাদের এমন খাবার বেছে নিতে হবে যা LDL কমাবে এবং HDL বাড়াবে।

এখন আসুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেই—কোন কোন খাবার কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

১ । ওটস ও অন্যান্য হোল-গ্রেইন খাবার

ওটসের মধ্যে রয়েছে বিটা-গ্লুকান,যা উচ্চ কোলেস্টেরল হ্রাস, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।। প্রতিদিন নাশতায় এক বাটি ওটমিল খেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোলেস্টেরল কমতে শুরু করবে। এছাড়াও ব্রাউন রাইস, বার্লি, মিলেট, গমের আটা জাতীয় হোল-গ্রেইন খাবার একইভাবে কাজ করে।

২ । শাক-সবজি ও ফল

শাক-সবজিতে আছে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেল। বিশেষ করে গাজর, পালং শাক, ঢেঁড়স, কচু শাক এগুলো কোলেস্টেরল কমাতে দারুণ কার্যকর। ফলগুলোর মধ্যে আপেল, কমলা, আঙুর, স্ট্রবেরি, নাশপাতি—এগুলোতে থাকে পেকটিন, যা LDL কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম শাক-সবজি ও ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন ।

৩ । বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার

আমন্ড, আখরোট, পেস্তা, কাজুবাদাম, ফ্ল্যাক্স সিড, চিয়া সিড, সূর্যমুখীর বীজ—এসব খাবারে থাকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। এগুলো খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল বাড়ায়। তবে খেয়াল রাখবেন, এগুলো ক্যালরিতে বেশি, তাই দিনে এক মুঠোর বেশি খাবেন না।

৪ । অলিভ অয়েল ও স্বাস্থ্যকর তেল

ভাজার জন্য নয়, বরং সালাদে বা হালকা রান্নায় অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন। এছাড়া সরিষার তেল, তিলের তেলও ভালো বিকল্প। যেসব তেলে ট্রান্স-ফ্যাট আছে, যেমন: ডালডা, বনস্পতি ঘি এগুলো একেবারেই এড়িয়ে চলুন।

৫ । মসুর ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি

ডালজাতীয় খাবারে রয়েছে প্রচুর সলিউবল ফাইবার, যা শরীরে ফ্যাট জমতে বাধা দেয়।
সপ্তাহে অন্তত ৪–৫ দিন একবেলা ডাল, ছোলা, বা মটরশুঁটি খাওয়া কোলেস্টেরল কমানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

৬ । মাছ – বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ

ইলিশ, সার্ডিন, স্যামন, টুনা, ম্যাকারেল ইত্যাদি মাছ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ। এগুলো রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করে এবং হার্টকে সুরক্ষিত রাখে। যাদের কোলেস্টেরল বেশি, তারা সপ্তাহে অন্তত ২ বার সামুদ্রিক মাছ খেতে পারেন।

৭ । গ্রিন টি

গ্রিন টিতে রয়েছে ক্যাটেচিনস নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রক্তের ফ্যাট কমায় এবং শরীরের মেটাবলিজম বাড়ায়। প্রতিদিন ১–২ কাপ গ্রিন টি খেলে কোলেস্টেরল ও ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৮ । রসুন

রসুনের মধ্যে রয়েছে এমন কিছু উপাদান যা কোলেস্টেরল কমাতে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১–২ কোয়া কাঁচা রসুন বা রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

৯ । এভোকাডো

এভোকাডোতে আছে স্বাস্থ্যকর মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা HDL বাড়ায় এবং LDL কমায়। সালাদে বা স্মুদিতে মিশিয়ে আপনি এগুলো খেতে পারেন।

১০ । ডার্ক চকলেট 

কোকোতে থাকে ফ্ল্যাভোনয়েডস, যা কোলেস্টেরল কমাতে ও হার্টকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে—চকলেটে যেন চিনি কম থাকে এবং ৭০% বা তার বেশি কোকো থাকে।

বন্ধুরা এতক্ষণ কোন কোন খাবার খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সেগুলো জানলাম ।আসেন এখন যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন সেগুলো নিয়ে আলাপ করি ।

কোলেস্টেরল কমানোর জন্য এই খাবারগুলো খাবেন না ।

১ । ভাজা-পোড়া খাবার যেমন সিঙ্গারা, সমুচা, পরোটা, ফাস্ট ফুড ইত্যাদি ।

২ । প্রসেসড মাংস 

৩ । ডালডা, বনস্পতি ঘি

৪ । বেশি চিনি, কেক, পেস্ট্রি

৫ । সফট ড্রিঙ্ক, বোতলজাত জুস

এই সমস্ত খাবার খেলে LDL হঠাৎ বেড়ে যায় এবং ধমনী ব্লক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। খাবারের বাইরেও আপনাকে জীবনযাপনেও কিছু পরিবর্তন আনতে হবে ।

যেমনঃ

  • প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করতে হবে ।

  • ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে ।

  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে ।

  • মানসিক চাপ কমাতে হবে ।

  • এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে ।

বন্ধুরা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও কঠিন নয়। আমারা যদি আমাদের খাবার তালিকায় সামান্য পরিবর্তন আনতে পারি তাহলেই আমরা অনেক  বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি।

তাই আজ থেকেই চেষ্টা করুন—

  • বেশি করে শাক-সবজি, ফল, ডাল, মাছ খেতে।

  • ভাজা-পোড়া, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিতে।

  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে।

মনে রাখবেন—সুস্থতাই  জীবনের আসল সম্পদ। তাই কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

আজ এ পর্যন্তই ।  নিয়মিত হাটুন সুস্থ থাকুন । আল্লাহ হাফেজ ।


No comments

Powered by Blogger.