হজম শক্তি বাড়াতে ঘরোয়া ১০টি উপায়

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হলো ভালো হজম শক্তি। কারণ শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ঠিকমতো শোষিত হয় শুধুমাত্র হজম প্রক্রিয়া ঠিক থাকলেই। কিন্তু ব্যস্ত জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, দুশ্চিন্তা কিংবা অলসতার কারণে অনেকেরই হজমশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে গ্যাস, অম্বল, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা রকম অস্বস্তিকর সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তবে সুসংবাদ হলো— হজম শক্তি বাড়ানোর জন্য ওষুধের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিছু সহজ এবং ঘরোয়া উপায় মেনে চললেই হজম প্রক্রিয়া শক্তিশালী ও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। আজকের আলোচনায় আমরা জানবো হজম শক্তি বাড়ানোর ঘরোয়া ১০টি কার্যকরী উপায় । তাহলে চলুন শরু করা যাক ।


হজম শক্তি কমে যাওয়ার সাধারণ লক্ষণ

চিকিৎসকদের মতে, হজম শক্তি দুর্বল হয়ে গেলে শরীরে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • বদহজম

  • গ্যাস তৈরি হওয়া

  • পেটে ফোলাভাব অনুভব করা

  • বুকজ্বালা বা জ্বালাপোড়া

  • পেটে ব্যথা

  • মলত্যাগে অনিয়ম

  • ক্ষুধা কমে যাওয়া

  • কোষ্ঠকাঠিন্য

  • দুর্বলতা ও মাথাব্যথা

  • বমি বমি ভাব

এগুলোই সাধারণত হজম শক্তি কমে গেলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে মনে রাখা জরুরি যে, এর বাইরে আরও কিছু লক্ষণও থাকতে পারে, যা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই এসব উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

হজম শক্তি কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ

হজম শক্তি দুর্বল হওয়ার পেছনে নানা ধরনের কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে আমাদের বাঙালি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের কিছু বিষয় এর জন্য দায়ী হতে পারে। সাধারণত যেসব কারণে হজম শক্তি নষ্ট হয়, তার মধ্যে রয়েছে—

  • গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি সমস্যা

  • অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া

  • কোষ্ঠকাঠিন্য ও মলত্যাগজনিত সমস্যা

  • খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফাইবারের অভাব

  • যথেষ্ট পানি না খাওয়া

  • অপর্যাপ্ত ঘুম

  • ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাব

  • কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

  • ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS)

  • অ্যালকোহল ও ধূমপানের অভ্যাস

  • মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা

যদি আপনার হজম শক্তি কমে যায়, তবে প্রথমেই এর মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ চিহ্নিত হলে তার ভিত্তিতেই সঠিক প্রতিকার বা চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব।

হজম শক্তি বাড়াতে খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রাকৃতিক উপায়ও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রিয় দর্শক আসুন হজমের সমস্যা দূর করার ১০টি সহজ উপায় নিয়ে আলোচনা করা যাক ।

ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার খান
প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত আঁশ যুক্ত করতে হবে। বেশি করে শাক-সবজি, আলু, ওটস, আপেল, বার্লি, স্ট্রবেরি, বাদামসহ বিভিন্ন ফলমূল খান। এসব স্বাস্থ্যকর খাবার খাবারকে দ্রুত হজমে সাহায্য করে। পাশাপাশি এগুলো অন্ত্রের সুস্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩.৭ লিটার এবং নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ২.৭ লিটার পানি প্রয়োজন হয় । তবে মনে রাখতে হবে, এর প্রায় ২০% পানি আমরা খাবারের মাধ্যমেই পেয়ে যাই। পানি শরীরের হজম প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখে, তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন
প্রোবায়োটিক আমাদের শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ায়। টকদই, কেফির, বাটারমিল্ক, লস্যি ইত্যাদি প্রোবায়োটিকের উৎকৃষ্ট উৎস । এসব খাবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে তোলে।

খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খান
খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া হজম শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম উপায়। সঠিকভাবে চিবিয়ে খেলে খাবারের টুকরোগুলো ছোট আকারে পরিণত হয়, যা হজমকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহজ হয়ে যায়। বিশেষ করে শক্ত খাবারের ক্ষেত্রে এটি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্গানিক অ্যাপল সাইডার ভিনেগার

গবেষণার এর তথ্য অনুযায়ী, অর্গানিক অ্যাপল সাইডার ভিনেগার আমাদের দেহে পেপসিন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ হজম এনজাইম তৈরিতে সহায়তা করে। এছাড়াও এটি পাকস্থলীতে প্রয়োজনীয় অম্লতা তৈরি করে, যা খাবার হজমে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই খাবারের আগে প্রতিদিন অর্ধেক চা-চামচ অ্যাপল সাইডার ভিনেগার খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

ঝাল ও চর্বিযুক্ত খাবার কম খান

অতিরিক্ত ঝাল, চর্বিযুক্ত বা তেলে ভাজা খাবার নিয়মিত খেলে গ্যাস্ট্রিক, অম্লতা এবং পাকস্থলীতে প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে। মুখরোচক খাবার অনেকেরই পছন্দ হলেও সুস্থ হজমের জন্য এগুলো যতটা সম্ভব পরিহার করাই ভালো।

নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম মেনে খাবার খাওয়া হজম শক্তি বাড়ানোর অন্যতম উপায়। অনিয়মিত খাবার বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে গ্যাস্ট্রিক ও বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি ধূমপান বা যেকোনো নেশাজাত দ্রব্য হজম ক্ষমতা নষ্ট করে—তাই অবশ্যই এসব থেকে দূরে থাকুন।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ঘুম অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হজমের সমস্যা, অস্বস্তি, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম না থাকলে হজম প্রক্রিয়া দুর্বল হতে পারে। হজম শক্তি বাড়াতে নিয়মিত ব্যায়াম করুন। যেমন—সকালে দৌড়ানো, সাঁতার কাটা, যোগব্যায়াম ইত্যাদি শরীর ও মনের জন্য উপকারী এবং হজম প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখে।

কিছু সহজ ঘরোয়া উপায়ও হজম শক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকর হতে পারে—

  • কাঁচা হলুদ: নিয়মিত কাঁচা হলুদ খেলে হজমের পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হার্ট সুস্থ রাখা ও মেদ কমাতেও সাহায্য করে।

  • আদা: এটি হজমে সহায়ক একটি ভেষজ। আদা চা, আদা স্যুপ বা আদার রস খাওয়া যেতে পারে।

  • উষ্ণ পানি: সকালে আধা গ্লাস হালকা গরম পানি পান করলে হজম প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। পানিতে জিরা গুঁড়া মিশিয়ে খেলেও বাড়তি উপকার পাওয়া যায়।

  • পেঁপে পাতা: কচি পেঁপে পাতা সিদ্ধ করে তার পানি খেলে হজম শক্তি উন্নত হয়।

হজম শক্তি বাড়ানোর জন্য শুধু খাবার তালিকায় পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়—এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি। সময়মতো ঘুমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ঝাল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নেশা থেকে দূরে থাকা—এসব বিষয় হজম শক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে মনে রাখবেন, বারবার বদহজম, পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হলে শুধু ঘরোয়া উপায় নয়, দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ আপনার চিকিৎসকই আপনার শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সঠিক পরামর্শ ও চিকিৎসা দিতে পারবেন।

তো আজ এ পর্যন্তই । আল্লাহ হাফেজ ।


No comments

Powered by Blogger.