খেজুর পানিতে ভিজিয়ে খেলে যে ১০ উপকারিতা
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের খাদ্যাভ্যাসে খেজুর গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মরুভূমির গাছ হলেও এর পুষ্টিগুণ আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বারবার খেজুরের কথা বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) নিজেও ইফতারের সময় খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙতেন। তবে শুধু খেজুর খাওয়া নয়, খেজুর পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি খাওয়ার অভ্যাসটিও স্বাস্থ্যের জন্য অসম্ভব উপকারী। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, খেজুর ভেজানো পানি প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংকের মতো কাজ করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
আজকের এই আলোচনায় আমরা জানবো খেজুর ভেজানো পানি নিয়মিত খেলে শরীর কীভাবে উপকৃত হয়, এই অভ্যাস কতটা সহজ এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই বা কি ? তো চলুন শুরু করা যাক ।
খেজুর ভেজানো পানি কী?
খেজুর ভেজানো পানি বলতে বোঝায়, রাতে বা অন্তত ৮ ঘণ্টা ধরে ২–৩টি খেজুর পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি সকালবেলা খালি পেটে পান করা এবং খেজুরগুলো খাওয়া। পানি খেজুরের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণগুলো নিজের মধ্যে শোষণ করে নেয়, ফলে এই পানি হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক পানীয়।
খেজুর পানিতে ভিজিয়ে খেলে যে ১০ উপকারিতা পাওয়া যায়
১। হজম প্রক্রিয়া সক্রিয় করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
খেজুরে রয়েছে উচ্চমাত্রার ডায়েটারি ফাইবার যা হজম শক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। খেজুর ভেজানো পানি খেলে অন্ত্রের গতিশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। যারা নিয়মিত সকালে পেট পরিষ্কার না হওয়ার সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য এটি প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে।খেজুরের ফাইবার অন্ত্রের গায়ে একটি সুরক্ষিত আবরণ তৈরি করে যা মল নরম করে এবং সহজে বের হতে সাহায্য করে।
২ । রক্তশূন্যতা দূর করে এবং হিমোগ্লোবিন বাড়ায়
খেজুরে রয়েছে প্রচুর আয়রন, যা রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে। বিশেষ করে নারীরা, যারা মাসিকচক্র বা সন্তান জন্মের কারণে রক্তাল্পতায় ভোগেন, তাদের জন্য খেজুর ভেজানো পানি একটি আদর্শ পানীয়। গর্ভবতী নারীদের খেজুর ভেজানো পানি খাওয়া নিরাপদ ও উপকারী, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে।
৩ । হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
খেজুরে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যকলাপে সাহায্য করে। খেজুর ভেজানো পানি রক্তনালীতে জমে থাকা কোলেস্টেরল দূর করে এবং হৃদপেশির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গবেষণা বলছে যারা নিয়মিত খেজুর ভেজানো পানি খায়, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২৫-৩০% পর্যন্ত কমে যায়।
৪ । মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়
খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ মস্তিষ্কের কোষকে শক্তি জোগায়। ফলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়ে। ছাত্রছাত্রী ও বয়স্কদের জন্য এটি বিশেষ উপযোগী। স্নায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেন খেজুরে থাকা ভিটামিন বি৬ নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে, যা মনকে প্রশান্ত করে এবং একাগ্রতা বাড়ায়।
৫ । ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর করে
খেজুর ভেজানো পানি প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংকের মতো কাজ করে। এতে থাকা কার্বোহাইড্রেট এবং প্রাকৃতিক চিনি শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে, যা ক্লান্তি দূর করে ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়। যাদের প্রতিদিন কাজের চাপ বেশি, তারা সকালে এটি খেলে সারাদিন প্রাণবন্ত বোধ করবেন।
৬ । ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখে
খেজুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন সি, ভিটামিন এ এবং জিঙ্ক ত্বকের কোষকে সজীব রাখে। এটি চুল পড়া রোধ করে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। রূপবিশেষজ্ঞরা বলছেন খেজুর ভেজানো পানি ত্বকে প্রাকৃতিক আভা এনে দেয় এবং ব্রণের প্রবণতা কমিয়ে দেয় ।
৭ । রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
খেজুর ভেজানো পানি ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান শরীরকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের সময়, যখন সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়ে, তখন খেজুর ভেজানো পানি শরীরকে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।
৮। লিভার পরিষ্কার রাখে ও ডিটক্সিফিকেশনে সাহায্য করে
খেজুর লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং এটি শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে। খেজুর ভেজানো পানি লিভারকে ক্লিন রাখে, যা হজম ও শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ফ্যাটি লিভার রোগীদের জন্য এটি একটি সহজ ও কার্যকর প্রাকৃতিক ডিটক্স পানীয়।
৯ । ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
খেজুরে থাকা ফাইবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং খাওয়ার প্রবণতা কমায়। ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ কম হয়। খেজুর ভেজানো পানি সকালে খেলে দিনের বাকি সময়ে ক্ষুধা কমে যায়। ডায়েট বিশেষজ্ঞদের মতে ওজন কমাতে চাইলে সকালে খেজুর ভেজানো পানি খাওয়া অত্যন্ত কার্যকর।
১০ । ঘুমের মান উন্নত করে
খেজুরে থাকা ম্যাগনেসিয়াম, ট্রিপটোফ্যান ও সেরোটোনিন স্নায়ুকে শান্ত করে এবং মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নিঃসরণ বাড়ায়। এটি ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন। খেজুর ভেজানো পানি নিয়মিত খেলে ঘুমের মান অনেক উন্নত হয়। যারা ইনসমনিয়ায় বা অনিদ্রায় ভোগেন, তাদের জন্য এটি একটি কার্যকর ঘরোয়া প্রতিকার।
এ ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু বৈজ্ঞানিক দিক রয়েছে
যেমন খেজুরে রয়েছে পলিফেনল, ক্যারোটিনয়েড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। এতে থাকা ফ্ল্যাভনয়েডস মস্তিষ্কের কোষ রক্ষা করে। গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ দ্রুত শক্তি দিয়ে থাকে, তবে এ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকা জরুরী । খেজুর ভেজানো পানি ডিহাইড্রেশন রোধে অত্যন্ত কার্যকর কারণ এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে।
কীভাবে আপনি খেজুর ভেজানো পানি তৈরি করবেন?
এ জন্য আপনি দুই থেকে চারটি ভালো মানের খেজুর নিন এবং এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি নিন । খেজুর গুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিন । রাতের বেলা এক গ্লাস পানিতে খেজুর গুলো ভিজিয়ে রাখুন । সকালে উঠে খালি পেটে সেই পানি পান করুন এবং খেজুরগুলো চিবিয়ে খান ।
চাইলেই এতে একটু লেবুর রস যোগ করতে পারেন এবং হালকা কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে পারেন ফলে এই পানীয় দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠবে ।
কিছু সতর্কতা
১ । ডায়াবেটিস রোগীরা খেজুর খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
২ ।খেজুর বেশি খেলে ওজন বাড়তে পারে, তাই ২–৩টির বেশি নয়।
৩ । খেজুরে কেমিক্যাল বা চিনি প্রক্রিয়াজাত না থাকলেই ভালো।
৪ । কিডনি রোগী বা উচ্চ পটাশিয়াম সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
খেজুর ভেজানো পানি একটি অত্যন্ত সহজ, প্রাকৃতিক এবং কার্যকর স্বাস্থ্য টনিক। এটি শরীরের হজম শক্তি বাড়ায়, ক্লান্তি দূর করে, ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য ধরে রাখে, হৃদপিণ্ড ও লিভার সুস্থ রাখে এবং ঘুমের গুণগত মান উন্নত করে। শুধু সকালে মাত্র ২-৩টি খেজুর পানিতে ভিজিয়ে খেলে আমরা দৈনন্দিন জীবনের অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে রেহাই পেতে পারি।
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে এমন একটি সহজ অভ্যাস আমাদের স্বাস্থ্যকে বিপুলভাবে উপকৃত করতে পারে। আধুনিক ও প্রাচীন—উভয় ধরনের চিকিৎসাশাস্ত্রই খেজুরের এই উপকারিতা স্বীকার করে নিয়েছে। তাই দেরি না করে আজ থেকেই শুরু হোক এক নতুন স্বাস্থ্য অভ্যাস – খেজুর ভেজানো পানি দিয়ে।
নিয়মিত হাটুন সুস্থ্য থাকুন । তো আজ এ পর্যন্তই । আল্লাহ হাফেজ ।
Post a Comment